গত এক দশকের কম সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি দক্ষতা ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে বার্ষিক গড় বেড়েছে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই সাত মিলিয়ন টন তেলের সমপরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এড়ানোর ফলে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় কমেছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ সময়সীমার আগেই জ্বালানি দক্ষতার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে বলে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)।
‘বাংলাদেশ এনার্জি এফিশিয়েন্সি গোলস উইথিন রিচ’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে জ্বালানি দক্ষতার উন্নতির ফলে বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে, যা দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল এনেছে। আইইইএফএ দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম এ প্রতিবেদনের লেখক।
প্রতিবেদনে গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহার ও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করে জ্বালানি দক্ষতার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। আইইইএফএ বাংলাদেশের লিড অ্যানলিস্ট শফিকুল আলম বলেন, ‘২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জ্বালানি দক্ষতা ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২০ শতাংশ। শুধু অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে ৭ দশমিক শূন্য ২ মিলিয়ন টন তেলসমতুল্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমেছে, যা প্রায় ৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় এড়াতে সহায়তা করেছে।’
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে প্রাথমিক অগ্রগতির পর জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি কমে যায়। তবে অর্থবছর ২০২১-২২ পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি সরবরাহে সংকট জ্বালানি দক্ষতাকে জরুরি অগ্রাধিকারে পরিণত করে। এর আগে ২০১৬ সালে প্রণীত এনার্জি এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশন মাস্টারপ্ল্যান এমন পরিস্থিতি মোকাবেলার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পরে অন্যান্য নীতিমালা প্রণয়ন, স্বল্প খরচে প্রাপ্ত অর্থায়ন ও সহায়ক কর্মসূচি বাংলাদেশকে তার জ্বালানি দক্ষতার লক্ষ্য অর্জন—এমনকি অতিক্রম—করার পথে এগিয়ে দিয়েছে।
আইইইএফএর গবেষক শফিকুল আলম আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে বার্ষিক গড় জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির হার প্রায় ১ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগেই অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানে (এনডিসি) ২০২২ সালের সাপেক্ষে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ জ্বালানি দক্ষতার লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এক বছর আগে থেকেই সে লক্ষ্যও অর্জনের পথে রয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, দেশের মোট জ্বালানির দুই-তৃতীয়াংশ যে খাতে ব্যবহার হয়, সেই গৃহস্থালি ও শিল্প খাতকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিলে আরো বেশি জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘বাজারে ন্যূনতম জ্বালানি কর্মদক্ষতা মানদণ্ড সম্পর্কে তথ্যের অসাম্য থাকায় জ্বালানি দক্ষতার লেবেল কার্যকর করা হলে, তা জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহারে লোকজনকে আকৃষ্ট করবে। এলইডির মতো সহজলভ্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যাপক গ্রহণ এবং কিছু শিল্পে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সত্ত্বেও শিল্প খাতে মোটর, মোটরচালিত সিস্টেম ও ক্যাপটিভ জেনারেটরে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস থেকে ইলেকট্রিক বয়লারে রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইভাবে বাণিজ্যিক খাত, যেখানে এসির চাহিদা বেশি, সেখানে জ্বালানির ব্যবহার কমাতে লেবেলিং ও প্যাসিভ ডিজাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এলইডি বাতির আমদানীকৃত যন্ত্রাংশের ওপর প্রায় ৬২ শতাংশ শুল্ক এবং ইনভার্টারযুক্ত কম্প্রেসরের ক্ষেত্রে উচ্চ ন্যূনতম আমদানি শুল্ক থাকায় প্রতিবেদনে সরকারকে এসব শুল্ক কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে মূল্যসংবেদনশীল ভোক্তাদের জন্য দক্ষ যন্ত্রপাতি আরো সাশ্রয়ী হয়।